নবজাত শিশুকে মায়ের কোল থেকে নিয়ে পুকুরে ফেলে দেয়া হয়েছে। বাসায় ঢুকে বাবাকে খুন করে মা এবং তার তিন মেয়েকে একসাথে ধর্ষণ করা হয়েছে। ৬ এবং ৯ বছর বয়সী দুই শিশুকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। এই বিভীষিকা থেকে পালিয়ে প্রতিবেশী দেশে ঢোকার জন্য যখন বর্ডার পেরোচ্ছে, তখনও পেছন থেকে গুলি করে তাদের হত্যা করা হয়েছে। মুক্তির কাছাকাছি এসেও মুক্তির স্বাদ পাওয়া হয়নি তাদের।


আরাকান থেকে রাখাইন: যুগে যুগে রোহিঙ্গা নিপীড়নের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
মধ্যযুগে আরাকান রাজ্যটি ব্যবসা-বাণিজ্য, জ্ঞান এবং সংস্কৃতি চর্চার এক প্রসিদ্ধ স্থান ছিল। সতের শতকের দিকে আরাকানের রাজধানীকে দ্বিতীয় ভেনিস হিসেবেও অভিহিত করেছে অনেকে। স্থানীয় রাজারাই তখন আরাকান রাজ্য শাসন করতো।
১৭৮৪ সালে বার্মার রাজা আরাকান দখল করে নেয়। তখন থেকেই আরাকানদের দুর্ভোগ শুরু হয়। ১৮২৪ সালে বার্মা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। একশ বছরের বেশি সময় ব্রিটিশদের গোলামির পর ১৯৪৮ সালে বার্মা পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা লাভ করে। সেই সময় মুসলিম অধ্যুষিত আরাকানের অনেক রোহিঙ্গাই চেয়েছিল আরাকান নবজাত মুসলিম রাষ্ট্র পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) অংশ হোক। কিন্তু আরাকানকে বার্মার অংশ হিসেবেই রাখা হয় এবং স্বাধীন বার্মার জন্মলগ্ন থেকেই তাদের উপর চলতে থাকে দমন নিপীড়ন। বিদ্রোহ দমনের নামে ১৯৫০ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে প্রথম সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়। দু’বছর পর ‘অপারেশন মায়ু’ নামে আরেকটি সামরিক অভিযান চালানো হয়। সরকারের এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ক্ষোভও ধীরে ধীরে দানা বাঁধতে থাকে। বিদ্রোহীর খাতায় নাম লেখায় অনেকে। ১৯৫৪ সালে ‘অপারেশন মুনসুন’ নামে আরেকটি জোরালো অভিযান চালু করে সেনাবাহিনী। চাপের মুখে ১৯৬১ সালে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে বিদ্রোহীরা।
১৯৬২ সালে সামরিক শাসকের বুটের নিচে চলে যায় বার্মার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। রোহিঙ্গাদের উপর নিপীড়ন আরও বেড়ে যায়। শুরু হয় রোহিঙ্গা নিধন। ১৯৭৪ সালে আরাকান রাজ্যের নাম পরিবর্তন করে ‘রাখাইন’ রাখা হয়। বহিরাগত তাড়ানোর নামে ১৯৭৮ সালে সেনাবাহিনী ‘অপারেশন কিং ড্রাগন’ নামে আরেকটি নতুন অভিযান চালায়। নির্বিচারে গ্রেফতার, খুন, ধর্ষণ, লুটতরাজ চলতে থাকে। কয়েক লাখ রোহিঙ্গা তখন প্রাণের ভয়ে পাড়ি জমায় বাংলাদেশে।
১৯৯১ সালে ‘অপারেশন ক্লিন এন্ড বিউটিফুল’ নামে আরেক দফা রোহিঙ্গা ছাটাই অভিযান চালায় জান্তা সরকার। এই নিপীড়নের মুখেও প্রায় দু’লাখ রোহিঙ্গা পাড়ি জমায় বাংলাদেশে।
তবে ২০১২ সাল থেকে শুরু হওয়া বর্বরতা পূর্বের সব হিসাবনিকাশ ছাড়িয়ে যায়। এক বৌদ্ধ তরুণীর ধর্ষণের জের ধরে রোহিঙ্গাদের প্রতি সহিংসতা শুরু হয়। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়, শত শত তরুণকে একসাথে গণ-গ্রেফতার করা হয়। মসজিদের পর মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। খুন, ধর্ষণ, গুমের সংখ্যা পূর্বের সব রেকর্ড ছাপিয়ে যায়। ২০১৩ সালে হিউম্যান রাইট ওয়াচের রিপোর্টে মায়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ‘জাতিগতভাবে নির্মূল অভিযান’ চালানোর অভিযোগ আনা হয়। ১৯৭০ সাল থেকে শুরু করে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা রাখাইন ত্যাগ করে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায়।
রোহিঙ্গা পরিস্থিতি: বর্তমান ও ভবিষ্যত
পুরো মায়ানমার জুড়ে মোট ১৩৫টির মতো জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। কিন্তু সরকার এবং চরমপন্থীদের রোষানলে পড়তে হচ্ছে শুধুমাত্র একটি সম্প্রদায়কেই। কারণ দুটি। প্রথমত, তারা মুসলমান এবং দ্বিতীয়ত, তাদের গাত্রবর্ণ বার্মিজদের মতো নয়, তারা কৃষ্ণবর্ণ। এই ধর্মবিশ্বাস এবং গাত্রবর্ণের জন্যই বার্মিজরা রোহিঙ্গাদের মায়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তারা বিশ্বাস করে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে আগত। ১৯৮৪ সালে সামরিক জান্তা আইন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করে। এমনি সু চি সরকারের আমলে হওয়া সাম্প্রতিক আদমশুমারিতেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি রোহিঙ্গাদের। কিন্তু ইতিহাস বলছে, তিন-চারশো বছর পূর্বেও এই আরাকানে রোহিঙ্গাদের শক্ত সাংস্কৃতিক শেকড় প্রোথিত ছিল। একসময় আরাকানের রাজা ছিল রোহিঙ্গারাই। কিন্তু সেই রাজারাই আজ শরণার্থী, মাথা গোঁজার জন্য এতোটুকু ঠাঁইও নেই।
শত শত বছর ধরে নিপীড়নের স্বীকার হয়ে আসলেও, সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গাদের উপর চালানো সরকারি বাহিনীর নৃশংসতা পুরো বিশ্বকেই হতবাক করে দিয়েছে। সাম্প্রতিক সহিংসতার সূত্রপাত ঘটে ২০১৬ সালের ২৫ আগস্ট। সরকারী তথ্যমতে, রাখাইনে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী রোহিঙ্গা সংঘ পুলিশের উপর আক্রমণ চালায়। এর জের ধরেই সরকার রাখাইনে রোহিঙ্গা নির্মূল অভিযানে নামে। এই অভিযানের অংশ হিসেবেই সরকারি বাহিনী উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের সহায়তা নিয়ে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিতে থাকে, নির্বিচারে গণহত্যা চালায়, তাদের পাশবিক নির্যাতন থেকে রেহাই পাচ্ছে না নারী ও শিশুরাও। সম্প্রতি জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চালানো ঘৃণ্য এই অভিযানকে ‘জাতিগত নির্মূলের একটি আদর্শ উদাহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। খুন, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের হাত থেকে বাঁচতে হাজারে হাজারে রোহিঙ্গা সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশে আসছে। বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ৪ লাখেরও বেশি শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এ সংখ্যা যে আরও বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য। কেননা, রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ চলছেই। পূর্বের প্রত্যেকবার এড়িয়ে গেলেও এবার বাংলাদেশ সরকারও আনুষ্ঠানিকভাবে রোহিঙ্গাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে। সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য কক্সবাজারের কুতুপালং-এ নতুন করে ২০ হাজার একর জমি এবং আরও ১৪ হাজার নতুন আশ্রম নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকার জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দকে এই সঙ্কটে মায়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগেরও আহবান জানিয়েছে। কিন্তু মায়ানমার সরকার এই বিষয়ে আগের মতোই নীরব রয়েছে। রোহিঙ্গাদের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার আগ পর্যন্ত তাদের পাশবিকতা থামবে বলে মনে হচ্ছে না।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন